আপসহীন থেকে ইতিহাসের অংশ—খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের চার দশক
- আপডেট সময় : ১১:১০:৩৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬ ২৩ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া একটি দীর্ঘ, বহুমাত্রিক ও ঘটনাবহুল অধ্যায়ের নাম। চার দশকের বেশি সময় তিনি দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিন দফায় মোট দশ বছরেরও বেশি সময় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করা এই নেত্রী তার রাজনৈতিক জীবনে ক্ষমতার উত্থান-পতন, কারাবাস, শারীরিক জটিলতা এবং তীব্র রাজনৈতিক বৈরিতার মুখোমুখি হয়েছেন বারবার। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক যুগের অবসান ঘটে।
জীবনের শেষ অধ্যায়: অসুস্থতা ও প্রস্থান
২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর সকাল ৬টায় ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান খালেদা জিয়া। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। কিডনি, লিভার, হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের জটিল সমস্যায় দীর্ঘদিন ভুগছিলেন তিনি। ২৩ নভেম্বর ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর টানা এক মাসের বেশি সময় চিকিৎসাধীন ছিলেন। মৃত্যুর পর তাকে তার স্বামী, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে দাফন করা হয়।
এর আগের বছর, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি যুক্তরাজ্যের লন্ডনে যান। লন্ডন ক্লিনিকে টানা ১৭ দিন চিকিৎসা শেষে ছেলে তারেক রহমানের বাসায় অবস্থান করেন এবং প্রায় চার মাস পর দেশে ফেরেন। ২০২৪ সালের জুনে তার হৃদপিণ্ডে স্থায়ী পেসমেকার স্থাপন করা হয়েছিল। করোনা মহামারির সময়, ২০২১ সালের এপ্রিলে তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়ে গুরুতর শ্বাসকষ্টে ভুগেছিলেন।
কারাবাস, মুক্তি ও রাজনৈতিক বন্দিত্ব
২০২০ সালের ২৫ মার্চ করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সময় পারিবারিক আবেদনের প্রেক্ষিতে শর্তসাপেক্ষে কারাগার থেকে মুক্তি পান খালেদা জিয়া। শর্ত অনুযায়ী তাকে গুলশানের বাসভবনে থাকতে হয় এবং বিদেশে যাওয়ার অনুমতি ছিল না। পরবর্তীতে কয়েক দফায় এই মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশে তিনি পূর্ণ মুক্তি পান এবং একই বছরের নভেম্বরে দুটি দুর্নীতি মামলায় উচ্চ আদালত থেকে খালাস লাভ করেন।
এর আগে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে যান তিনি। বিএনপি শুরু থেকেই এসব মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে এসেছে।
আন্দোলন, নির্বাচন ও রাজনৈতিক সংঘাত
২০১৭ সালের ১২ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপির জনসভাই ছিল খালেদা জিয়ার শেষ বড় প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্য। নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন ও ভোটের সময় সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানান তিনি। এর পর থেকে কার্যত তার প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত হয়ে পড়ে।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের প্রতিবাদে নির্বাচন বর্জন করে। এর আগে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে গুলশানের কার্যালয়ে অবরুদ্ধ হন খালেদা জিয়া। এসব আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার জন্ম দেয়।
শাসনামল ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত
২০০১ সালে নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে তৃতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। তার শাসনামলে ২০০২ সালে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ এবং ২০০৪ সালে র্যাব গঠন করা হয়, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। একই সময়ে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দেশ-বিদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
ক্ষমতায় আরোহণ ও বিরোধী রাজনীতি
১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আপসহীন অবস্থানের কারণে তিনি দ্রুত জাতীয় রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। ১৯৯৬ সালে স্বল্পমেয়াদি সরকার গঠন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়।
রাজনীতিতে পদার্পণ ও ব্যক্তিগত জীবন
১৯৮২ সালে সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপিতে যোগ দিয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় হন খালেদা জিয়া। ১৯৮৪ সালে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হয়ে টানা ৪১ বছর এই দায়িত্ব পালন করেন। তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ঘটে স্বামী জিয়াউর রহমানের ১৯৮১ সালের হত্যাকাণ্ডের পর।
খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের জলপাইগুড়িতে। ১৯৬০ সালে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। ব্যক্তিগত জীবনে ২০১৫ সালে ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
উপসংহার
খালেদা জিয়ার জীবন কেবল একজন রাজনীতিকের নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। সমর্থক ও সমালোচক—উভয় পক্ষের কাছেই তিনি ছিলেন প্রভাবশালী ও বিতর্কিত এক চরিত্র। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক দীর্ঘ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটলো, যার রেশ ভবিষ্যত রাজনীতিতেও বহমান থাকবে।




















