মাধ্যমিক পাঠ্যক্রমে যুক্ত হলো ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান
- আপডেট সময় : ১২:১৪:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী ২০২৬ ১৬ বার পড়া হয়েছে
মাধ্যমিক শিক্ষাক্রমে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় ‘২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান’। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) প্রণীত নতুন পাঠ্যবইগুলোতে কোটা সংস্কার আন্দোলন, আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিবর্ষণ, ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলা এবং শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ঘটনাপ্রবাহ স্থান পেয়েছে। একই সঙ্গে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার ইতিহাস।
এনসিটিবি থেকে প্রকাশিত এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির বিভিন্ন বিষয়ের পাঠ্যবই পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় (ইতিহাস), বাংলা সাহিত্য এবং ইংরেজি—এই তিনটি বিষয়ের বইয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক দিক আলাদাভাবে তুলে ধরা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের বয়স ও বোধগম্যতার কথা বিবেচনায় রেখে কোথাও সংক্ষিপ্ত, কোথাও বিস্তৃত অধ্যায় ও পাঠ সংযোজন করা হয়েছে।
ষষ্ঠ শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’-এর পাঠ–৯ এ ‘বাংলাদেশ সৃষ্টির পটভূমি ও স্বাধীন বাংলাদেশ’ শিরোনামে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার ছবি ও বিবরণ পুনরায় যুক্ত করা হয়েছে। পাঠ্যবইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং পরদিন ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে পুনরায় সেই ঘোষণা দেন। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়।
একই বইয়ের পাঠ–১০ এ ‘স্বাধীন বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান’ শিরোনামে নতুন পরিচ্ছেদ সংযোজন করা হয়েছে। সেখানে ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একদলীয় শাসন, ১৯৭৯ সালে বহুদলীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন, ১৯৮২ সালে এরশাদের ক্ষমতা দখল এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিক বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এই অংশে ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পাশাপাশি ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কথাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাঠে শহীদ নূর হোসেনের ঐতিহাসিক ছবি এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত করা ছবিও যুক্ত রয়েছে।
পাঠ্যবইয়ে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিরোধী মত দমনে গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল করার মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের জুনে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামলে সরকারদলীয় সন্ত্রাসী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সহিংসতা চালায়। ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদ এবং চট্টগ্রামে ওয়াসিম আকরামসহ ছয়জন নিহত হন। এসব ঘটনার পর আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে শেখ হাসিনার পদত্যাগের একদফা দাবি ওঠে। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে এবং তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এই ঘটনাপ্রবাহকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ নামে অভিহিত করা হয়েছে।
সপ্তম শ্রেণির বাংলা বই ‘সপ্তবর্ণা’-য় কবিতা অংশে যুক্ত হয়েছে হাসান রোবায়েতের লেখা ‘সিঁথি’। কবিতার পাঠ-পরিচিতিতে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন ছিল নির্মম ও মর্মন্তুদ অভিজ্ঞতা হলেও এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই মানুষ নতুন করে মুক্তির স্বাদ পেয়েছে। কবিতায় শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ, রক্তপাত এবং মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে।
একই শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে বাংলাদেশের গণআন্দোলনের ধারাবাহিকতার সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিস্তারিত বিবরণ যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সূচনা, আন্দোলন দমনে হত্যাকাণ্ড এবং হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
অষ্টম শ্রেণির বাংলা বইয়ের সাহিত্য কণিকায় ‘গণঅভ্যুত্থানের কথা’ শিরোনামের প্রবন্ধে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নিকট ইতিহাসে তিনটি বড় গণঅভ্যুত্থান হয়েছে—১৯৬৯, ১৯৯০ এবং ২০২৪ সালে। প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের আন্দোলনের নেতৃত্ব ছিল শিক্ষার্থীদের হাতে এবং সহস্র মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে এই আন্দোলন সফল হয়।
নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ বইয়ে ‘আমাদের নতুন গৌরবগাথা’ শিরোনামের প্রবন্ধে ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান, কারফিউ উপেক্ষা করে মানুষের রাজপথে নেমে আসা, ব্যাপক প্রাণহানি এবং সরকারপ্রধানের দেশত্যাগের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। ইংরেজি বই ‘English For Today’-এ যুক্ত হয়েছে ‘Graffiti’ শিরোনামের অধ্যায়, যেখানে আবু সাঈদের নিহত হওয়ার ঘটনা এবং তার মায়ের হৃদয়বিদারক উক্তি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পাঠ্যবইয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্তর্ভুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিরা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পাদক মুঈনুল ইসলাম বলেন, এই আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি ছিল না; এটি ছিল শিক্ষার্থী ও জনতার স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ। পাঠ্যবইয়ে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের সত্য তুলে ধরা নতুন প্রজন্মকে প্রকৃত ইতিহাস জানার সুযোগ করে দেবে।
এদিকে এনসিটিবি জানিয়েছে, গত ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট পাঠ্যবইয়ের ৮৪ দশমিক ৭৮ শতাংশ সরবরাহ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি বইগুলো আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে বিতরণ শেষ হবে। এনসিটিবির তথ্যমতে, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে মোট ৩০ কোটি ২ লাখের বেশি পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং প্রাথমিক স্তরের সব বই ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছেছে। মাধ্যমিক স্তরের বই বিতরণও দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।




















