আসামে ‘ঘোষিত বিদেশি’দের বাংলাদেশে পুশ-ব্যাকের দুষ্টচক্র
- আপডেট সময় : ১০:৫৯:১৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে
হাসান আলীর দিন কাটছে গভীর উদ্বেগে। ৫৮ বছর বয়সী বাবা তাহের আলী জানুয়ারির হাড়কাঁপানো শীতে কোথায় আছেন, কীভাবে বেঁচে আছেন—সে প্রশ্নের উত্তর তাঁর জানা নেই। গত আট মাসে আসাম সরকার তাহের আলীকে তিনবার ভারত থেকে বাংলাদেশ সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে ঠেলে দিয়েছে। দুইবার বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) তাঁকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ফেরত পাঠিয়েছে। তবু থামেনি পুশ-ব্যাক। ফলে এক মানবিক সংকটে আটকে পড়েছেন তাহের আলীর মতো বহু মানুষ।
তাহের আলী ‘ঘোষিত বিদেশি’। সারা জীবন আসামে কাটালেও ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে নিজেকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করতে না পারায় তাঁর নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই অভিযুক্তের বক্তব্য না শুনে একতরফা রায় দেওয়া হয়েছে—তাহের আলীর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে বলে পরিবারের দাবি। ট্রাইব্যুনালে মামলা হারালে উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও গত বছরের মে মাস থেকে সেই আইনি প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে আসাম সরকার রাতের আঁধারে বন্দুকের মুখে ‘ঘোষিত বিদেশিদের’ বাংলাদেশে পুশ-ব্যাক করছে।
আসামের বিজেপি সরকার ১৯৫০ সালের ইমিগ্রান্টস (এক্সপালশন ফ্রম আসাম) অ্যাক্টের দোহাই দিয়ে এই বহিষ্কারকে বৈধ বলে দাবি করছে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নেতৃত্বে নভেম্বর থেকে অন্তত ২২ জনকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে পরিবারগুলোর আদালতে যাওয়ার কোনো সুযোগই থাকছে না।
কিন্তু বাংলাদেশ এসব মানুষকে গ্রহণ না করায় তারা পড়ে যাচ্ছে পুশ-ব্যাক ও প্রত্যাবর্তনের এক ভয়াবহ দুষ্টচক্রে। স্ক্রলের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ১৯ ডিসেম্বরের পর থেকে আসামের অন্তত সাতজন বাসিন্দাকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। বিজিবি ঢুকতে না দিলে তারা আবার ভারতে ফেরত এসেছে—এবং পুনরায় পুশ-ব্যাকের শিকার হয়েছে। প্রতিবেশী দেশের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের মধ্যে চারজন বর্তমানে বাংলাদেশের পুলিশের হেফাজতে।
হাসান আলীর প্রশ্ন, ‘আমার দেশ আমার বাবাকে বাংলাদেশি বলছে, আর বাংলাদেশ তাঁকে ফেরত পাঠাচ্ছে। তাহলে আমাদের দেশ কোনটা? আমাদের কি আদৌ কোনো দেশ আছে?’ তাঁর দাবি, তাহের আলী ভারতীয় ভোটার, তাঁর দাদার নাম ১৯৬৫ সালের ভোটার তালিকায় রয়েছে, ১৩ জন ভাই-বোন সবাই ভারতীয় নাগরিক। তবু কেন শুধু তাঁর বাবাকেই বাংলাদেশি বানানো হলো—এই প্রশ্নের উত্তর মিলছে না।
তাহের আলীর ঘটনা আরও জটিল। ২০০৯ সালে নওগাঁর এক ট্রাইব্যুনাল তাঁকে বিদেশি ঘোষণা করে। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি তেজপুর ডিটেনশন সেন্টারে চার বছর কাটান। ২০২৫ সালের মে মাসে ‘ঘোষিত বিদেশিদের’ বিরুদ্ধে ধরপাকড় শুরু হলে তাঁকে আবার আটক করা হয়। পরে কোকড়াঝাড় হোল্ডিং সেন্টার থেকে ১৯ ডিসেম্বর প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরের শ্রীভূমি (করিমগঞ্জ) সীমান্তে নিয়ে গিয়ে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই ভারতে ফেরার চেষ্টায় আটক হন তিনি। এরপর ২৮ ডিসেম্বর তাঁকে আবারও, এবার ধুবরি সীমান্ত দিয়ে, তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশে পাঠানো হয়।
একই ধরনের ভাগ্য বরণ করেছেন নগাঁও জেলার ৪৫ বছর বয়সী দিনমজুর ইদ্রিস আলী। ২০১৬ সালে তাঁকেও বিদেশি ঘোষণা করা হয়। তিন বছর ডিটেনশন সেন্টারে থাকার পর মুক্তি পেলেও আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে তিনি উচ্চ আদালতে যাননি। মে মাসে আবার আটক হয়ে প্রথমবার বাংলাদেশে পুশ-ব্যাক হন। পরে গোপনে ভারতে ফিরলে তাঁকে আবার ধরা হয় এবং ডিসেম্বরের নির্দেশের পর দ্বিতীয়বার বহিষ্কার করা হয়। তাঁর পরিবার জানে না, তিনি এখন কোন দেশে—বা আদৌ কোনো দেশে—আছেন।
আইনজীবী ও গবেষকদের মতে, এই পুশ-ব্যাক নীতি ভারতের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অভিষেক সাহার ভাষায়, এটি রাষ্ট্রহীনতা তৈরির প্রক্রিয়া—মানুষকে দুই দেশের মধ্যে টেনিস বলের মতো ছুড়ে মারা হচ্ছে। দিল্লিভিত্তিক আইনজীবী উজ্জয়িনী চ্যাটার্জির মতে, জাতীয়তা যাচাই ও আনুষ্ঠানিক হস্তান্তর ছাড়া এ ধরনের বহিষ্কার স্বেচ্ছাচারিতারই উদাহরণ।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ১৯৫০ সালের আইনটি ভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে প্রণীত হয়েছিল—ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালেরও আগে। আজকের বাস্তবতায় সেই আইন দেখিয়ে নির্বাহী আদেশে মানুষকে নো-ম্যানস ল্যান্ডে ঠেলে দেওয়া ‘হাস্যকর ও বিপজ্জনক’। এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে শুধু তাহের বা ইদ্রিস নন—আসামের আরও হাজারো মানুষ অনিশ্চয়তার অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।


























