মোহাম্মদপুর-আদাবর: ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডব জনজীবন অতিষ্ঠ
- আপডেট সময় : ১০:২৭:৫৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬ ৩৪ বার পড়া হয়েছে
রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকা এখন সাধারণ মানুষের কাছে আতঙ্কের নাম। বছরের পর বছর ধরে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যে এই এলাকায় জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি আদাবরে চাঁদাবাজির প্রতিবাদে ব্যবসায়ীদের দোকানপাট বন্ধ রাখা এবং থানা ঘেরাওয়ের ঘটনা আবারও এলাকার নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামনে এনেছে। স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং পুলিশের নির্লিপ্ততা এই অপরাধ প্রবণতা বাড়ার প্রধান কারণ।
মোহাম্মদপুরের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি, সবখানেই ছিনতাইকারীরা ওঁত পেতে থাকে। রিকশাযাত্রী, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষেরা প্রধান লক্ষ্য। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছুটির সময়ে মোবাইল, ব্যাগ ও ল্যাপটপ ছিনতাইয়ের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে। এমনকি রাইড শেয়ারিং চালকরাও নিরাপত্তার অভাবে মোহাম্মদপুর এলাকায় যেতে অনীহা প্রকাশ করছেন। পুলিশের তথ্যমতে, সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টার মধ্যে ছিনতাইয়ের হার সবচেয়ে বেশি।
চাঁদাবাজির উৎপাতও এই এলাকায় অসহ্য। স্থানীয় বাজার, ফুটপাতের দোকান, গ্যারেজ ও নির্মাণাধীন ভবনে নিয়মিত, সাপ্তাহিক বা মাসিক ভিত্তিতে চাঁদা দাবি করা হয়। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ প্রকাশ করতে ভয় পান, কারণ প্রতিবাদ করলে হামলার ঝুঁকি ও জীবনহানির আশঙ্কা থাকে।
অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কিশোর গ্যাং ব্যবহৃত হয়। স্কুল-কলেজপড়ুয়া কিশোররা একাংশ ‘এলাকাভিত্তিক’ গ্যাং গড়ে প্রভাব বিস্তার করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শক্তি প্রদর্শন, মোটরবাইক শোডাউন ও মারামারি দিয়ে শুরু হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা ছিনতাই ও মাদক ব্যবসার দিকে গড়ে ওঠে। ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদপুর অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। গ্রেফতারকৃত কিশোর গ্যাং সদস্যদের বয়স সাধারণত ১৪ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে।
মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকার বাসিন্দারা সম্প্রতি একাধিকবার মিছিল ও সমাবেশের মাধ্যমে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দা ইশতিয়াক সজীব বলেন, ‘‘অলিতে-গলিতে ছিনতাই ও কিশোর গ্যাং সদস্যরা ধারালো ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা করছে, কিন্তু পুলিশের ভূমিকা নগণ্য।’’ আরেক বাসিন্দা ইসমাইল পাটোয়ারী বলেন, ‘‘অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশের কাছ থেকে কোনো সহায়তা পাওয়া যায় না। ঘটনার সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার পরই তারা কিছু ক্ষেত্রে অ্যাকশনে আসে।’’
চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে ব্যবসায়ীরা ২১ ফেব্রুয়ারি আদাবর থানার ঘেরাও এবং রাস্তা অবরোধ করেন। বসিলা, চাঁদ উদ্যান ও আদাবর এলাকায় চাঁদাবাজি ও গণছিনতাই প্রতিরোধের দাবি তুলে তারা বিক্ষোভে অংশ নেন। স্থানীয় এমব্রয়ডারি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রায়হান জহিরের ভাতিজা মারুফ হাসান সুমন বলেন, চাচার কারখানায় কিশোর গ্যাং সদস্যরা চাঁদা দাবি করে হামলা চালায়। তাদের অস্বীকৃতি জানালে আহত হন দুই শ্রমিক।
স্থানীয় চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ ফারুক বা কালা ফারুককে ২২ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে এলাকায় চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে মাইকিং করা হয়। ফারুকের বিরুদ্ধে বসিলা সিটি হাউজিং ও বসিলা ৪০ ফিট এলাকায় ব্যবসায়ীদের চাঁদা দাবির অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. মো. তৌহিদুল হক বলেন, ‘‘ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকায় দারিদ্র্য, পারিবারিক অস্থিতিশীলতা এবং মাদক চক্র কিশোরদের অপরাধে টেনে নেয়। ছোট অপরাধ বড় অপরাধী নেটওয়ার্কে রূপ নিলে নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে যায়।’’
মোহাম্মদপুর থানার ওসি মেজবাহ উদ্দিন ও আদাবর থানার ওসি জিয়াউর রহমান জানান, ধারাবাহিক অভিযান ও টহল জোরদার করা হয়েছে। কিশোর গ্যাং ও মাদকদ্রব্য দমন পরিকল্পিতভাবে করা হচ্ছে।
পুলিশি তৎপরতা নিয়ে রাজধানীর আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, ‘‘মোহাম্মদপুর এলাকায় কিশোর গ্যাং, ছিনতাই ও মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার করা হয়েছে। ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করা, মহাসড়ক নিরাপদ রাখা এবং হোয়াইট-কলার অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও অস্ত্রধারী আসামিদের বিরুদ্ধে সারা দেশে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হবে। ঢাকা থেকে শুরু করে এ অভিযান দেশে প্রভাবশালী ও দাগী আসামিদের আইনের আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত হবে।




















