খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য নিয়ে গুজব, বাস্তবতা ও চিকিৎসকের কঠিন মূল্যায়ন
- আপডেট সময় : ১১:৫১:১৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ৭৩ বার পড়া হয়েছে
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নানা গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। এরই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী একজন ক্রিটিক্যাল কেয়ার স্পেশালিস্ট ও বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে খালেদা জিয়ার বর্তমান অবস্থা নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হলেও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে কিছু বাস্তবতা পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, খালেদা জিয়া ‘ক্লিনিক্যালি ডেড’—এমন দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘ক্লিনিক্যালি ডেড’ নামে চিকিৎসাবিজ্ঞানে কোনো স্বীকৃত টার্ম নেই। মৃত্যু মানে মৃত্যু। কেবল ‘ব্রেইন ডেড’ নামক একটি টার্ম রয়েছে, যা গুরুতর ব্রেইন ইনজুরি বা ব্রেইন হেমারেজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে এমন কোনো অবস্থা নেই।
নিজের পরিচয় তুলে ধরে ওই চিকিৎসক জানান, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিনের অধ্যাপক এবং টানা ২৪ বছর ধরে এই ক্ষেত্রেই কাজ করছেন। প্রতিদিনই তিনি খালেদা জিয়ার মতো জটিল ও সংকটাপন্ন রোগীদের চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত থাকেন। তার দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতায় তিনি দাবি করেন, বেঁচে থাকার লড়াই ও মানসিক দৃঢ়তার দিক থেকে খালেদা জিয়ার তুলনা তিনি খুব কমই দেখেছেন।
চিকিৎসকের মতে, সাধারণভাবে এই ধরনের জটিল রোগী উন্নত দেশের আইসিইউতেও দীর্ঘদিন বাঁচেন না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে কিছু ‘রুল অব থাম্ব’ রয়েছে, যেগুলো খালেদা জিয়া একাধিকবার ভুল প্রমাণ করেছেন। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, মারাত্মক ফাঙ্গাল ইনফেকশনে আক্রান্ত হার্ট ভাল্ভের রোগীদের ক্ষেত্রে জরুরি ওপেন হার্ট সার্জারি ছাড়া বাঁচার সম্ভাবনা থাকে না। কিন্তু খালেদা জিয়া অন্তত দুইবার এমন পরিস্থিতিতেও টিকে গেছেন, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাঠ্যবইয়ের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
বর্তমান শারীরিক অবস্থার বিষয়ে তিনি জানান, খালেদা জিয়া লাইফ সাপোর্টে রয়েছেন। ভেন্টিলেটর সাপোর্টের পাশাপাশি রক্তচাপ ধরে রাখতে ওষুধ দিতে হচ্ছে, ডায়ালাইসিস চলছে এবং এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ ব্যাগের বেশি রক্ত দেওয়া হয়েছে। তবে সেডেশন কমানো হলে তিনি জেগে উঠতে পারেন এবং মানুষ চিনতেও সক্ষম হন। চিকিৎসকের ভাষায়, একের পর এক ‘ব্যাটল’ জিতলেও ধীরে ধীরে তার শরীর সামগ্রিক যুদ্ধে হার মানাচ্ছে।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়ে তিনি বিশেষভাবে প্রশংসা করেন ব্যক্তিগত চিকিৎসা সমন্বয়ক অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের। তার উদ্যোগে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী মেডিকেল টিম গঠিত হয়েছে বলে জানান তিনি। হৃদরোগ, এওর্টিক ভাল্ভ রুট সার্জারির মতো অত্যন্ত বিশেষায়িত ক্ষেত্রেও বিশ্বের শীর্ষ কেন্দ্রগুলো থেকে বিশেষজ্ঞ যুক্ত করা হয়েছে। চিকিৎসকের মতে, এমন একটি সমন্বিত ও দক্ষ টিম গঠন করা যে কোনো পরিস্থিতিতেই বিরল।
তবে সব প্রশংসার পরও সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেন তিনি শেষ অংশে। নিজের ১৬ বছরের শিক্ষাজীবন ও ২৪ বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে খালেদা জিয়ার সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা এখন শূন্যের কোঠায়। এর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স। দেশে দীর্ঘদিন ধরে অপ্রয়োজনীয় ও যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে এমন কিছু ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয়েছে, যেগুলো প্রায় সব ধরনের বিদ্যমান অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতিরোধী। এই ধরনের সংক্রমণ খালেদা জিয়ার মতো জটিল রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের হাতে কার্যকর অস্ত্র প্রায় থাকে না।
সবশেষে ওই চিকিৎসক একটি মানবিক আবেদন জানান। তার ভাষায়, চিকিৎসক ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসেবে তিনি মনে করেন, এবার খালেদা জিয়াকে কিছুটা ‘রেহাই’ দেওয়া উচিত। যতদিন তার আয়ু রয়েছে—তা দিন, সপ্তাহ বা মাস যাই হোক না কেন—এই সময়টা যেন তাকে আর অতিরিক্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আক্রমণাত্মক প্রক্রিয়া বা কষ্টকর চিকিৎসার মধ্যে না রাখা হয়। বরং বাকি সময়টা যেন তাকে যতটা সম্ভব আরাম ও শান্তিতে কাটানোর সুযোগ দেওয়া হয়।




















