ঢাকা ১০:৪০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ৯ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
কেন্দুয়ায় জমি বিরোধে সংঘর্ষে নারী নিহত, আহত ৩০ চট্টগ্রাম সিটি কলেজে হামলার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবি ছাত্রশিবিরের গজারিয়ায় এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্ন নিয়ে অনিয়মিত শিক্ষার্থীদের আপত্তি তনু হত্যা মামলায় ১০ বছর পর সাবেক সেনা কর্মকর্তা গ্রেপ্তার মাগুরায় আমগাছে ঝুলন্ত অবস্থায় যুবকের মরদেহ উদ্ধার শেরপুরে অবৈধ ডিজেল জব্দ, ফিলিং স্টেশনকে জরিমানা গৌরনদীতে অ্যাম্বুলেন্স–ইজিবাইক সংঘর্ষে ৭ জন আহত হজযাত্রীদের ব্যয় কমাতে বিমান ভাড়া হ্রাস করার পরিকল্পনা: ধর্মমন্ত্রী ড. সাইমুম পারভেজকে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী হিসেবে নিয়োগ লালমনিরহাট–কুড়িগ্রাম সীমান্তে বিজিবির অভিযানে গাঁজা ও মদ জব্দ

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত হারাচ্ছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, হুমকির মুখে পর্যটন ও পরিবেশ

শাকুর মাহমুদ চৌধুরী, উখিয়াঃ
  • আপডেট সময় : ১২:৫৭:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৫ ১০২ বার পড়া হয়েছে
বিপিসি ডেস্ক: বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, বাংলাদেশের গর্ব, দেশের পর্যটনের প্রাণকেন্দ্র এবং প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের এক মহার্ঘ্য ভাণ্ডার। প্রতিদিন হাজারো ভ্রমণপিপাসু দেশি-বিদেশি পর্যটক ভিড় জমান এই সাগরতীরে। নীল জলরাশি, গর্জনরত ঢেউ আর সবুজ ঝাউবনের অনন্য শোভা মুগ্ধ করে সবাইকে।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সৌন্দর্যের বুক চিরে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ সংকেত। ঢেউয়ের প্রবল আঘাত ও উপকূল ভাঙনের কারণে সৈকতের ঝাউবন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সারি সারি ঝাউগাছ উপড়ে পড়ে সাগরে ভেসে যাচ্ছে, হাঁটার পথ ও বসার জায়গা ভেঙে যাচ্ছে। একের পর এক পয়েন্ট ভাঙনের কবলে পড়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, গত কয়েক বছরে হিমছড়ি, কলাতলী, লাবণী, সুগন্ধা ও শৈবাল পয়েন্টে ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন অংশ ভাঙনের শিকার হচ্ছে। একসময় যেখানে পর্যটকদের হাসি-কোলাহলে মুখরিত ছিল, আজ সেখানে ভাঙনের ক্ষতচিহ্ন।
উপকূলীয় পরিবেশবিদদের মতে, ঝাউগাছ শুধু সৌন্দর্য নয়, বরং এটি প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ। ঝাউবন ঢেউয়ের আঘাত শোষণ করে, বালু ধরে রাখে, সৈকতের ভারসাম্য বজায় রাখে। ঝাউবন ধ্বংস হয়ে গেলে সৈকতের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ে, ফলে সামুদ্রিক ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ে।
পরিবেশ বিশ্লেষক ও দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার উখিয়া প্রতিনিধি হুমায়ুন কবির জুশান বলেন, সমুদ্রের এমন ভাঙন আমাদের গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যদি এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, কক্সবাজার সৈকতের ঐতিহ্য ও নিরাপত্তা দুটোই বিপন্ন হয়ে পড়বে।
ঢাকা সাভার থেকে ঘুরতে আসা পর্যটক শাহনাজ পারভীন শিমু বলেন, আমরা এখানে শুধু নীল জলরাশি দেখতে আসি না, চাই সমুদ্রের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে। কিন্তু প্রতিনিয়ত ভাঙনের দৃশ্য দেখে মন খারাপ হয়। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে কক্সবাজারের আকর্ষণ কমে যাবে।
দৈনিক কক্সবাজার ৭১ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক বেলাল উদ্দিন বেলাল বলেন, কক্সবাজার সৈকত শুধু পর্যটন নয়, এটি বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ইমেজ। দ্রুত সময়ে সঠিক ব্যবস্থা না নিলে সৈকতের মনোরম পরিবেশ ও সৌন্দর্য বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, সৈকতের ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ ও কংক্রিট স্ল্যাব বসানোর কাজ শিগগিরই শুরু হবে। পাশাপাশি নতুন ঝাউবন রোপণের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
তবে পরিবেশবিদরা মনে করেন, এগুলো কেবল অস্থায়ী সমাধান। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া প্রকৃত সমাধান সম্ভব নয়। বৈজ্ঞানিক গবেষণা, পরিবেশবান্ধব উপকূল ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করাই হতে পারে স্থায়ী সমাধানের পথ।
দৈনিক রূপালী সৈকত এর সম্পাদক, বিশিষ্ট কলামিস্ট ও পরিবেশবাদী নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, কক্সবাজার সৈকত আমাদের জাতীয় সম্পদ, প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। ভাঙন রোধে কেবল জিও ব্যাগ বসিয়ে লাভ হবে না। প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। উপকূলের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করলে সৈকতের ঝুঁকি কমানো যাবে না। একই সঙ্গে পর্যটন, পরিবেশ ও স্থানীয় মানুষের স্বার্থকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
কক্সবাজার সৈকত কেবল একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গর্ব। কিন্তু ভাঙনের থাবায় এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এখনই কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ না নিলে আগামী প্রজন্ম হয়তো আর দেখতে পাবে না ঝাউবনে ঘেরা সেই মনোমুগ্ধকর সৈকত, যা একদিন আমাদের দেশকে বিশ্বের মানচিত্রে বিশেষ মর্যাদা এনে দিয়েছিল।
কক্সবাজারের সৈকত রক্ষা মানে শুধু পর্যটন রক্ষা নয়, বরং বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও পরিবেশ রক্ষা।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত হারাচ্ছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, হুমকির মুখে পর্যটন ও পরিবেশ

আপডেট সময় : ১২:৫৭:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৫
বিপিসি ডেস্ক: বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, বাংলাদেশের গর্ব, দেশের পর্যটনের প্রাণকেন্দ্র এবং প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের এক মহার্ঘ্য ভাণ্ডার। প্রতিদিন হাজারো ভ্রমণপিপাসু দেশি-বিদেশি পর্যটক ভিড় জমান এই সাগরতীরে। নীল জলরাশি, গর্জনরত ঢেউ আর সবুজ ঝাউবনের অনন্য শোভা মুগ্ধ করে সবাইকে।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সৌন্দর্যের বুক চিরে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ সংকেত। ঢেউয়ের প্রবল আঘাত ও উপকূল ভাঙনের কারণে সৈকতের ঝাউবন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সারি সারি ঝাউগাছ উপড়ে পড়ে সাগরে ভেসে যাচ্ছে, হাঁটার পথ ও বসার জায়গা ভেঙে যাচ্ছে। একের পর এক পয়েন্ট ভাঙনের কবলে পড়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, গত কয়েক বছরে হিমছড়ি, কলাতলী, লাবণী, সুগন্ধা ও শৈবাল পয়েন্টে ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন অংশ ভাঙনের শিকার হচ্ছে। একসময় যেখানে পর্যটকদের হাসি-কোলাহলে মুখরিত ছিল, আজ সেখানে ভাঙনের ক্ষতচিহ্ন।
উপকূলীয় পরিবেশবিদদের মতে, ঝাউগাছ শুধু সৌন্দর্য নয়, বরং এটি প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ। ঝাউবন ঢেউয়ের আঘাত শোষণ করে, বালু ধরে রাখে, সৈকতের ভারসাম্য বজায় রাখে। ঝাউবন ধ্বংস হয়ে গেলে সৈকতের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ে, ফলে সামুদ্রিক ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ে।
পরিবেশ বিশ্লেষক ও দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার উখিয়া প্রতিনিধি হুমায়ুন কবির জুশান বলেন, সমুদ্রের এমন ভাঙন আমাদের গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যদি এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, কক্সবাজার সৈকতের ঐতিহ্য ও নিরাপত্তা দুটোই বিপন্ন হয়ে পড়বে।
ঢাকা সাভার থেকে ঘুরতে আসা পর্যটক শাহনাজ পারভীন শিমু বলেন, আমরা এখানে শুধু নীল জলরাশি দেখতে আসি না, চাই সমুদ্রের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে। কিন্তু প্রতিনিয়ত ভাঙনের দৃশ্য দেখে মন খারাপ হয়। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে কক্সবাজারের আকর্ষণ কমে যাবে।
দৈনিক কক্সবাজার ৭১ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক বেলাল উদ্দিন বেলাল বলেন, কক্সবাজার সৈকত শুধু পর্যটন নয়, এটি বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ইমেজ। দ্রুত সময়ে সঠিক ব্যবস্থা না নিলে সৈকতের মনোরম পরিবেশ ও সৌন্দর্য বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, সৈকতের ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ ও কংক্রিট স্ল্যাব বসানোর কাজ শিগগিরই শুরু হবে। পাশাপাশি নতুন ঝাউবন রোপণের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
তবে পরিবেশবিদরা মনে করেন, এগুলো কেবল অস্থায়ী সমাধান। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া প্রকৃত সমাধান সম্ভব নয়। বৈজ্ঞানিক গবেষণা, পরিবেশবান্ধব উপকূল ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করাই হতে পারে স্থায়ী সমাধানের পথ।
দৈনিক রূপালী সৈকত এর সম্পাদক, বিশিষ্ট কলামিস্ট ও পরিবেশবাদী নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, কক্সবাজার সৈকত আমাদের জাতীয় সম্পদ, প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। ভাঙন রোধে কেবল জিও ব্যাগ বসিয়ে লাভ হবে না। প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। উপকূলের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করলে সৈকতের ঝুঁকি কমানো যাবে না। একই সঙ্গে পর্যটন, পরিবেশ ও স্থানীয় মানুষের স্বার্থকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
কক্সবাজার সৈকত কেবল একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গর্ব। কিন্তু ভাঙনের থাবায় এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এখনই কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ না নিলে আগামী প্রজন্ম হয়তো আর দেখতে পাবে না ঝাউবনে ঘেরা সেই মনোমুগ্ধকর সৈকত, যা একদিন আমাদের দেশকে বিশ্বের মানচিত্রে বিশেষ মর্যাদা এনে দিয়েছিল।
কক্সবাজারের সৈকত রক্ষা মানে শুধু পর্যটন রক্ষা নয়, বরং বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও পরিবেশ রক্ষা।