ঘন ঘন ভূমিকম্পে আতঙ্কিত দেশ, বড় ঝুঁকিতে ঢাকা মহানগরী
- আপডেট সময় : ১০:০৬:৪৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ৩৪ বার পড়া হয়েছে
রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে গত কয়েক মাস ধরে ঘন ঘন ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় জনমনে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের মাত্র ২৭ দিনের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১০ বার মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার কম্পন রেকর্ড করা হয়েছে। এতে বিশেষ করে প্রায় দুই কোটি মানুষের আবাসস্থল ঢাকা মহানগরীতে ভবনধস ও প্রাণহানির আশঙ্কা আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।
সবশেষ শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১টা ৫৪ মিনিটে ৫ দশমিক ৩ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলা। জুমার নামাজের পরপরই কম্পন অনুভূত হওয়ায় দেশজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এর একদিন আগে বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) দেশের বিভিন্ন এলাকায় আরেকটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ইউরোপীয়-ভূমধ্যসাগরীয় ভূমিকম্প কেন্দ্র (ইএমএসসি) জানায়, রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৭ এবং উৎপত্তিস্থল ছিল ভারতের সিকিম রাজ্যে, যা বাংলাদেশের সীমান্তের খুব কাছাকাছি।
ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই কম্পনের ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ১ ফেব্রুয়ারি সিলেটে ৩ মাত্রার কম্পনের মধ্য দিয়ে এই প্রবণতার সূচনা হয়। ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে পরপর দুবার কেঁপে ওঠে দেশ, যার কেন্দ্র ছিল মিয়ানমারে। একই দিন ভোরে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলায় ৪ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি সিলেট অঞ্চলে যথাক্রমে ৩ দশমিক ৩ ও ৪ মাত্রার কম্পন রেকর্ড করা হয়। ১৯ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের ছাতক থেকে ৪ দশমিক ১ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে ৫ দশমিক ১ মাত্রার একটি মাঝারি ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল মিয়ানমারের সাংগাই অঞ্চলের মনিওয়া শহরের নিকটবর্তী এলাকা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘন ঘন এই কম্পন কেবল সংখ্যার বিষয় নয়; বরং এটি ভূগর্ভস্থ প্লেটের অস্বাভাবিক অস্থিরতার ইঙ্গিত হতে পারে। তাদের আশঙ্কা, ঢাকায় ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানলে লাখো ভবন ধসে পড়তে পারে এবং বিপুল প্রাণহানি ঘটতে পারে। জাতীয় প্রস্তুতির ঘাটতি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতিকে ঝুঁকি বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে ঢাকা
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) সম্প্রতি জানিয়েছে, টাঙ্গাইলের মধুপুর ফল্টে ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকার প্রায় ৪০ শতাংশ ভবন ধসে পড়তে পারে এবং দুই লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। রাজউকের আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের জরিপ অনুযায়ী, রাজধানীতে ২১ লাখ ৪৫ হাজার ভবন রয়েছে। এর বড় অংশই জাতীয় ভবন নির্মাণ কোড অনুসরণ না করে নির্মিত হয়েছে। প্রায় ৯৫ শতাংশ ভবন অনুমোদিত নকশার বাইরে তৈরি হয়েছে বলে সংস্থাটির তথ্য বলছে।
গত বছরের ২১ নভেম্বর ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর জরুরি জরিপে ঢাকার ৩০০টি ভবনকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সে সময় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১৪টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে জানান ঢাকা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার ভৌগোলিক গঠন ও ফল্ট লাইনের অবস্থান দুর্যোগ মোকাবিলায় কিছুটা সহায়ক হলেও অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। ভবনগুলো অনেক ক্ষেত্রে একটির সঙ্গে আরেকটি লাগোয়া হওয়ায় একটি ভবন হেলে পড়লে পাশের ভবনও ঝুঁকিতে পড়ে। এছাড়া সরু রাস্তা ও খোলা জায়গার ঘাটতি উদ্ধারকাজে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
পুরান ঢাকা ও ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’ উদ্বেগ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞদের মতে, আপাতদৃষ্টিতে পুরান ঢাকাকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলেও মূল সমস্যা শুধু ভবনের বয়স নয়; বরং সরু রাস্তা ও ঘনবসতি। ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ব্যাপক ভবনধস ও হতাহতের আশঙ্কা রয়েছে।
গবেষকরা আরও সতর্ক করছেন তথাকথিত ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’ নিয়ে—যে ফল্ট ভূ-পৃষ্ঠ পর্যন্ত দৃশ্যমান নয় এবং মানচিত্রে সহজে শনাক্ত করা যায় না। ঢাকার আশপাশে এ ধরনের ফল্ট থাকলে তা বড় ধরনের অপ্রত্যাশিত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। জরুরি ভিত্তিতে কঠোরভাবে ভবন নির্মাণ বিধিমালা কার্যকর করা, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত ও সংস্কার, খোলা জায়গা সংরক্ষণ এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। তা না হলে ঘন ঘন ছোট কম্পন একদিন বড় বিপর্যয়ের পূর্বাভাস হয়ে দাঁড়াতে পারে।




















