চলন্ত ট্রেনে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট চালুর উদ্যোগে নতুন সম্ভাবনা
- আপডেট সময় : ০৫:২৯:২০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬ ১৫ বার পড়া হয়েছে
ট্রেনে ভ্রমণের সময় মোবাইল নেটওয়ার্কে বারবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া কিংবা ইন্টারনেটের ধীরগতির সমস্যা দীর্ঘদিনের। গুরুত্বপূর্ণ ফোনকল কেটে যাওয়া, অনলাইন কাজ থেমে যাওয়া এবং বিনোদনে বিঘ্ন ঘটার মতো ভোগান্তি যাত্রীদের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছিল। এই সমস্যার সমাধানে এবার স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবার দিকে এগোচ্ছে সরকার। চলতি বছরের শুরুতে পরীক্ষামূলকভাবে আন্তঃনগর ট্রেনে স্টারলিংক প্রযুক্তির মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবা চালু করে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে।
গত ঈদুল ফিতরের আগে দেশের কয়েকটি আন্তঃনগর ট্রেনে পরীক্ষামূলকভাবে স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সংযোগ চালু করা হয়। এতে যাত্রীরা নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ব্যবহার করতে সক্ষম হন বলে জানা গেছে। যাত্রীদের অভিজ্ঞতা ও সন্তুষ্টির ভিত্তিতে সেবাটি সব আন্তঃনগর ট্রেনে চালুর দাবি উঠেছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলও বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে।
তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৩ মার্চ প্রথমবারের মতো চলন্ত ট্রেনে সরাসরি স্যাটেলাইটভিত্তিক উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়। এতে সহযোগিতা করে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড এবং বাংলাদেশ রেলওয়ে।
প্রাথমিকভাবে পর্যটক এক্সপ্রেস, কক্সবাজার এক্সপ্রেস, উপবন এক্সপ্রেস ও বনলতা এক্সপ্রেসসহ কয়েকটি আন্তঃনগর ট্রেনে ফ্রি ওয়াই-ফাই সেবা চালু করা হয়। প্রতিটি বগিতে কিউআর কোড সংযুক্ত করা হয়, যা স্ক্যান করেই যাত্রীরা সহজে ইন্টারনেট সংযোগ নিতে পারেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সংযোগ পাওয়া যায় এবং জটিল কোনো সেটআপ ছাড়াই সেবা গ্রহণ সম্ভব হয় বলে জানানো হয়েছে।
পরীক্ষামূলক পর্যায়ে এই সেবায় যাত্রীদের সাড়া ছিল উল্লেখযোগ্য। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কয়েকটি ট্রেনে যাত্রীরা সম্মিলিতভাবে প্রায় ১১ টেরাবাইট ডেটা ব্যবহার করেছেন। বিশেষ করে যেসব রুটে মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল, সেখানে এই সেবা বেশি কার্যকর বলে মনে করা হচ্ছে। অনেক যাত্রী পুরো যাত্রাপথে নিরবচ্ছিন্নভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পেরেছেন বলেও জানিয়েছেন।
যাত্রীদের অভিজ্ঞতাও ইতিবাচক। কেউ কেউ জানিয়েছেন, আগে ট্রেনে ভিডিও দেখা বা অনলাইন কাজ করা প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু নতুন সেবার মাধ্যমে তারা ভিডিও স্ট্রিমিংসহ বিভিন্ন অনলাইন কার্যক্রম স্বাচ্ছন্দ্যে করতে পেরেছেন। কিউআর কোড স্ক্যান করার পর দ্রুত সংযোগ পাওয়া এবং স্থিতিশীল নেটওয়ার্ক পাওয়া এই সেবার বড় সুবিধা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শুধু ট্রেন নয়, ভবিষ্যতে বাস ও ফেরিতেও স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, একটি একক সাবস্ক্রিপশন ব্যবস্থার মাধ্যমে যাত্রীরা ট্রেন, বাস ও ফেরি—সব পরিবহনে একই অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে ইন্টারনেট সুবিধা নিতে পারবেন। এতে ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা আরও সহজ ও সমন্বিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। চলন্ত অবস্থায় যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তিগত ত্রুটি দ্রুত সমাধান এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা অন্যতম সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব সমস্যা মূলত ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয় সংক্রান্ত, যা সময়ের সঙ্গে সমাধানযোগ্য।
এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এই সেবাকে টেকসই করতে একটি কার্যকর ব্যবসায়িক মডেল তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শুধু সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভর না করে বেসরকারি পরিবহন খাতকেও এতে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং সেবার মান উন্নত হবে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের।
বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চলন্ত ট্রেনে পরীক্ষামূলক সাফল্যের পর ধাপে ধাপে এই সেবা দেশের অন্যান্য গণপরিবহনে সম্প্রসারণের কাজ চলছে। একইসঙ্গে দেশের দুর্গম এলাকায় স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও জোরদার করা হয়েছে। সীমান্তবর্তী অঞ্চল, হাওর এলাকা এবং নেটওয়ার্কবিহীন বিভিন্ন স্থানে ইতোমধ্যে ১১১টি পয়েন্টে এই সেবা চালু হয়েছে।
বর্তমানে দেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট ‘বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১’-এর ব্যবহারও বাড়ছে। এর মাধ্যমে টেলিভিশন সম্প্রচারসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়া হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সেবা রপ্তানির সম্ভাবনাও যাচাই করা হচ্ছে। নেপাল ও ফিলিপাইনসহ কয়েকটি দেশে স্যাটেলাইট সেবা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ চলছে বলে জানা গেছে।
সব মিলিয়ে চলন্ত ট্রেনে স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবার এই উদ্যোগ বাংলাদেশের গণপরিবহন ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। পরীক্ষামূলক সাফল্য এখন বাণিজ্যিক বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে যাত্রীসেবায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।




















