সংবাদ শিরোনাম ::
সীমান্তে ল্যান্ডমাইন আতঙ্ক… বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা, শরণার্থীদের জীবনে নতুন শঙ্কা
শাকুর মাহমুদ চৌধুরী, উখিয়াঃ
- আপডেট সময় : ১২:০৭:৪৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৫ ৫৭ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় বসানো এসব লুকানো মাইনে পা দিয়ে প্রতিবছর আহত হচ্ছে বহু বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা শরণার্থী। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটনাগুলো এক ভয়াবহ মানবিক সংকটে রূপ নিচ্ছে।
২৩ বছরের রোহিঙ্গা নারী নূর কায়দার জীবনের গল্প তারই একটি নির্মম উদাহরণ। রাখাইনের মংডুতে বাড়ি ফেরার পথে মাইনে পা দিয়ে ডান পা হারিয়েছেন তিনি। এখন টেকনাফের এক শরণার্থী শিবিরে অসহায়ভাবে দিন কাটছে তার।
আমি পরিবারের জন্য বোঝা হয়ে গেছি, চোখের জলে ভেসে এমনটিই বললেন কায়দা।
২০২৩ সালের শেষের দিকে মিয়ানমারের আরাকান আর্মি (এএ) ও সেনাবাহিনীর সংঘর্ষের পর বাস্তুচ্যুতরা যখন ধীরে ধীরে গ্রামে ফেরার চেষ্টা শুরু করছিল, তখনই বাড়িঘরের আঙিনা ও পথঘাটে মাইন পুঁতে রাখা হয় বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। ফলে নিরাপদে বাড়ি ফেরার আশা ধুলিস্যাৎ হয়ে যায়।
কায়দার মতো অনেক রোহিঙ্গাই জানান, মাইন বসানো হয়েছে শুধু শরণার্থীদের ফিরে আসা ঠেকাতেই নয়, সীমান্ত বাণিজ্যের রুট নিয়ন্ত্রণ করতেও।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের প্রথম ছয় মাসে মিয়ানমার সীমান্তে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে অন্তত ১৮ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৭ জন বাংলাদেশি এবং একজন রোহিঙ্গা।
২০২৪ সালের আগের বছরগুলোতেও হতাহতের সংখ্যা কম নয়—২০২৩ সালে পাঁচজন, ২০২২ সালে আটজন এবং গত বছর দুই রোহিঙ্গা নিহতসহ অন্তত ছয়জন আহত হয়েছিলেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই মিয়ানমার সেনাবাহিনী ১৪টি রাজ্যে নিষিদ্ধ ল্যান্ডমাইন বসাচ্ছে। ল্যান্ডমাইন মনিটর–২০২৪ মিয়ানমারকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী দেশ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। শুধু ২০২৩ সালেই মাইন বিস্ফোরণে মারা গেছে ও আহত হয়েছে এক হাজারের বেশি মানুষ, যা ২০২২ সালের প্রায় তিনগুণ।
১৩ জুলাই কক্সবাজারের উখিয়ার হলদিয়াপালং ইউনিয়নের পাতাবাড়ি গ্রামের যুবক মোহাম্মদ হোসেন বাঁশ সংগ্রহ করতে গিয়ে মাইনে পা দিয়ে একটি পা হারান। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
বিজিবি জানিয়েছে, আহতদের বেশিরভাগই সীমান্ত অতিক্রম করে কাঠ, বাঁশ বা অন্যান্য দ্রব্য সংগ্রহে গিয়েছিলেন অথবা অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের চেষ্টা করছিলেন।
১১ বিজিবি ব্যাটালিয়নের কমান্ডার লে. কর্নেল এসকেএম কাফিল উদ্দিন কায়েস বলেন,
আগে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষীরাই মাইন বসাতো, এখন করছে আরাকান আর্মি। যারা অবৈধভাবে মিয়ানমারের ভেতরে প্রবেশ করছে তারাই মূলত এসব দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। তিনি আরও জানান, অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী জড়িত থাকায় আন্তর্জাতিক সমন্বয় ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সীমান্তে চলমান ল্যান্ডমাইন সংকট কেবল হতাহতের সংখ্যা বাড়াচ্ছে না, একইসঙ্গে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফেরার সম্ভাবনাকেও অনিশ্চিত করে তুলছে। প্রতিদিন নতুন নতুন পঙ্গুত্ব আর মৃত্যুর খবর সীমান্তবাসীর জীবনে আতঙ্ক বয়ে আনছে।




















